ই-কমার্স ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য

ইন্টারনেটের প্রতুলতা এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে ই-কমার্স সাইটগুলো বাংলাদেশের ব্যবসাঙ্গনে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্বল্প বিনিয়োগে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করা যায়। গৃহিণী থেকে শুরু করে লাখো বেকার মানুষ তাদের ট্যাগলাইন থেকে বেরিয়ে এসে একজন সফল ই-কমার্স ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে পারেন। ব্যবসার সাথে বিনিয়োগ এবং কৌশলের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তার কী কী করণীয়, তা নিয়েই আজকের আমাদের এই লেখা।

ই-কমার্স ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য

মার্কেট রিসার্চ

ব্যবসা শুরুর আগে প্রথমে আপনাকে মার্কেটের হালচাল সম্পর্কে জানতে হবে। আর মার্কেট রিসার্চের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে।

  • মার্কেটে কোন পণ্যের চাহিদা তুঙ্গে রয়েছে,
  • কাস্টমারের চাহিদা,
  • কাস্টমাররা কোন পণ্যগুলো ই-কমার্স সাইট থেকে কিনে থাকে,
  • তারা কীভাবে এবং কোন মাধ্যমে পণ্যগুলো ডেলিভারি নিতে পছন্দ করে,
  • বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কোন মাধ্যমে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকে,
  • কোন পণ্য কতদিনের মধ্যে ডেলিভারি দেওয়া হয়ে থাকে,
  • ঢাকা শহর এবং ঢাকা শহরের বাইরে কোন পরিবহনের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি করা হয়ে থাকে,
  • ই-কমার্স সাইটে যে পণ্যগুলো বিক্রয় করা হয়ে থাকে,
  • সেগুলো কোথায় থেকে সোর্স করা হয়,
  • ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে ইনভেনটরি ব্যবস্থাপনা কেমন হয়,
  • পণ্যভেদে কারা কীভাবে ওয়ারেন্টি বা রিপ্লেসমেন্ট সুবিধা প্রদান করছে,
  • কোন কোন ক্ষেত্রে কাস্টমার রিফান্ড পেতে পারে,
  • ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা কাস্টমারদেরকে কী এবং কীভাবে ডিসকাউন্ট বা অন্যান্য সুবিধা দিচ্ছে,
  • যে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ই-কমার্স ব্যবসাটি পসার লাভ করে থাকে, অন্যরা সেটি কিভাবে ডিজাইন করছে,
  • মার্কেটে ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী কারা এবং তাদের ব্যবসার মূলনীতি,
  • তারা কোন ধরণের পণ্য তাদের সাইটে বিক্রয় করছে

কোন পণ্য নিয়ে আপনি ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করতে চান?

আপনাকে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে যে, আপনি কোন পণ্য নিয়ে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করতে চান। এক্ষেত্রে কিছুটা কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। আপনার ব্যবসার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক পণ্য নির্ধারণের উপর। কাস্টমারের চাহিদা এবং পণ্যের সহজলভ্যতার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিন। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস, প্রয়োজনীয় জিনিস, গিফট আইটেম, কাপড়-চোপড়, বই-খাতা-পেন্সিল জাতীয় ইত্যাদি পণ্য ক্যাটাগরি থেকে আপনার পছন্দের পণ্যটি বাছাই করুন। আর কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের উদ্যোগ নিতে চাইলে, এলাকাভিত্তিক বিখ্যাত পণ্যগুলো যেগুলো আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থেকে উপভোগ বা ব্যবহার করতে পারি না, সেগুলো থেকে বাছাই করে একটি পণ্যকে নির্বাচন করতে পারেন।

মনে রাখতে হবে, আপনি যে পণ্য নিয়ে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করবেন, পরবর্তী সময়ে ব্যবসার প্রসার ঘটানোর বা পণ্য তালিকা বৃদ্ধির জন্য একই জাতীয় পণ্য যোগ করা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এমন পণ্য বাছাই করুন, যা আপনি খুব সহজে এবং কম পরিবহণ খরচে সংগ্রহ করতে পারবেন।

নির্বাচিত পণ্যটি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করুন

পণ্য নির্বাচন হয়ে গেলে ঝটপট নেমে পড়ুন পরিকল্পনা তৈরির কাজে। আপনি পণ্যটি কীভাবে সকলের সামনে উপস্থাপন করবেন, ওয়েবসাইটে পণ্যটির কী কী তথ্য এবং ছবি শেয়ার করবেন, সেগুলো ঠিক করুন। সর্বোপরি, আপনার কৌশলগুলো কীভাবে প্রয়োগ করবেন, তা সম্পর্কে একটা নোট করে ফেলুন।

আপনার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি নাম নির্ধারণ  করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতির জন্য একটি নামের প্রয়োজন। আপনি যে ধরনের পণ্য বিক্রয় করবেন, তার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে, আকর্ষণীয়, সুন্দর, সাবলীল ও শ্রুতিমধুর একটি নাম পছন্দ করুন। আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে যেন কাস্টমারেরা একটা ধারণা নিতে পারে যে, এই সাইটটিতে গেলে তারা কী ধরনের পণ্য ক্রয় করতে পারবে।

ওয়েবসাইট নির্মাণ

কাস্টমাররা আপনার ই-কমার্স সাইটের ওয়েবসাইটে এসে পণ্য ক্রয় করবে। তাই আপনাকে এর নির্মাণ সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমেই বলি, কোন প্ল্যাটফর্মে আপনি আপনার ওয়েবসাইটিটি নির্মাণ করবেন। আপনি পিএইচপি টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারেন। বিভিন্ন সিএমএস যেমন ম্যাজেন্টো, ওপেনকার্ট, এক্সকার্ট, ওকমার্স ইত্যাদি বা কাস্টোমাইজড প্ল্যাটফর্ম যেমন লারাভেল ব্যবহার করতে পারেন।

পিএইচপি টেকনোলজি ব্যবহারের কিছু অসুবিধা রয়েছে, যেমন ভবিষ্যতে ওয়েবসাইটে যদি কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়, তাহলে তা কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং পিএইচপি ভিত্তিক ওয়েবসাইটে কিছু সিকিউরিটি ইস্যু থাকে। অপরদিকে সিএমএস বা কাস্টোমাইজড প্ল্যাটফর্মগুলো পরিবর্তন আনা সহজ এবং সিকিউরিটি ইস্যু নিয়ে ভাবতে হয় না।

এতো গেল ব্যাক এন্ডের কথা। ফ্রন্ট এন্ডে আপনার ওয়েবসাইটটিকে দৃষ্টিনন্দন ও ইউজার ফ্রেন্ডলি করে তোলার জন্য আপনাকে কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রথমত, ওয়েবসাইটে প্রত্যেক ক্ষেত্রে হাই কোয়ালিটি ইমেজ ব্যবহার করুন। কাস্টমারদের রেজিস্ট্রেশনের ফর্মটিতে ম্যানুয়াল রেজিস্ট্রেশন, রেজিস্ট্রেশন উইথ ফেসবুক ও রেজিস্ট্রেশন উইথ গুগলের অপশন রাখুন। আপনার ওয়েবসাইট থেকে পণ্য ক্রয়ের প্রক্রিয়াটি সহজ করতে হবে, যাতে মাত্র কয়েকটি ধাপে পণ্য কেনা যায়।  

ই-কমার্স ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র প্রস্তুত করা

ব্যবসার বৈধতা হিসেবে আপনাকে অবশ্যই ট্রেড লাইসেন্স করাতে হবে। এছাড়াও টিন, ভ্যাট এগুলো ডকুমেন্ট সময়ের সাথে করে নিতে হবে।

পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা

আপনার ই-কমার্স সাইটে যে পণ্যগুলো বিক্রয় করবেন, তার জন্য একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে সেগুলো হলো-

  • কাঁচামাল জাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহণ ও সংরক্ষণের চার্জ যুক্ত হবে।
  • হোলসেল পণ্যের ক্ষেত্রে রিটেইল প্রাইস বিবেচনায় আসবে।
  • ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্যটা আলোচনা সাপেক্ষ হবে।

পণ্যের ডেলিভারি সিস্টেম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া

আপনি কোন পণ্য কীভাবে, কোন এলাকাতে কোন মাধ্যমে ডেলিভারি দিতে চান, তা নির্ধারণ করুন। আর এই ডেলিভারি সিস্টেমের উপর নির্ভর করে আপনি কাস্টমারকে পণ্য ডেলিভারির একটি টাইম ফ্রেম বলে দিতে পারবেন। যেমন, ঢাকার অভ্যন্তরে পণ্য ডেলিভারির জন্য আপনি নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থা বা পাঠাও'র মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করতে পারেন। আর ঢাকার বাইরে পণ্য ডেলিভারির জন্য এসএ পরিবহণ বা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের সাথে চুক্তি করতে পারেন।

আর পণ্য ডেলিভারির ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার কাছে একটি ট্র্যাকিং সিস্টেম রাখতে হবে। তাহলে আপনার জন্য ট্র্যাক করা খুব সহজ হবে।

মূল্য পরিশোধের মাধ্যম এবং নিরাপত্তা চূড়ান্ত করা

ই-কমার্স সাইট থেকে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে কাস্টমারদের জন্য আপনাকে অনলাইন ও অফলাইন উভয় পেমেন্ট সিস্টেম রাখতে হবে। অনলাইন পেমেন্টের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য আপনাকে অবশ্যই SSL Gateway ব্যবহার করতে হবে। আর অফলাইন পেমেন্ট সিস্টেম আপনি কয়েক ধরনের রাখতে পারেন যেমন– ক্যাশ অন ডেলিভারি, কার্ড অন ডেলিভারি। কাস্টমার ভেদে মূল্য পরিশোধের মাধ্যমের ভিন্নতা রাখতে হয়, যাতে সবধরনের কাস্টমার তাদের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী মূল্য পরিশোধ করতে পারে।

কিওয়ার্ড রিসার্চ

আপনার সাইটটিকে সকলের কাছে পরিচিত করে তুলতে আপনাকে অবশ্যই কিওয়ার্ড নিয়ে রিসার্চ করতে হবে। কাস্টমাররা কোন ধরনের কিওয়ার্ড দিয়ে সবচেয়ে বেশি সার্চ করে থাকে, সেগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন। এবার এসব কিওয়ার্ড দিয়ে আপনার সাইটে একটি ব্লগের অপশন রাখতে পারেন। কিওয়ার্ডগুলো ব্যবহার করে যখন আপনি নিয়মিতভাবে ব্লগে কন্টেন্ট পাবলিশ করবেন, তখন কাস্টমারের সার্চ রেজাল্টে আপনার সাইটটি চলে আসবে।

আপনার টার্গেট কাস্টমার নির্ধারণ করা

আপনি যখন ই-কমার্স ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করছেন, তখন আপনাকে আপনার সাইটের পণ্যের জন্য টার্গেট কাস্টমার নির্ধারণ করতে হবে। আপনি কাদের কাছে আপনার পণ্য বিক্রয় করবেন, সেটা ঠিক করুন।

ব্র্যান্ডিং

ব্র্যান্ডিং হলো কাস্টমারের কাছে আপনার প্রতিশ্রুতি। হাজারো পণ্য বা সেবার ভিড়ে কাস্টমার কেন আপনার ই-কমার্স সাইটের পণ্য ক্রয় করবে তা নির্ভর করে আপনার ব্র্যান্ডিংয়ের উপর এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঝে আপনাকে একটি একক সত্ত্বা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। আপনার ব্যবসার ধরন এবং টার্গেট কাস্টমার সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায় ব্র্যান্ডিং থেকে। তাই সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করুন।

মার্কেটিং

কথায় আছে “প্রচারেই প্রসার”। আপনি যত ভালো মানের পণ্য এবং চমৎকার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসা শুরু করুন না কেন, আপনি যদি সঠিকভাবে মার্কেটিং না করেন, তাহলে পুরো প্রচেষ্টাটাই মাঠে মারা যাবে। মার্কেটিংয়ের মাধ্যমেই কাস্টমার আপনার পণ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। তাই সম্ভাব্য সকল মাধ্যমে মার্কেটিং করুন যেমন- সোশ্যাল মিডিয়া, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পেইড অ্যাড, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন, পোস্টার, লিফলেট, বিলবোর্ড ইত্যাদি।

কাস্টমার সেবা

ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি দক্ষ টিম থাকা প্রয়োজন, যারা হাসিমুখে, সদা সক্রিয়ভাবে কাস্টমার সেবা প্রদান করবে। এটি ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয়। এখানে যেহেতু সরাসরি দোকানে গিয়ে পণ্য দেখার বা কোনো ধরনের সমস্যা হলে তা সরাসরি আলোচনার সুযোগ নেই, তাই কাস্টমারদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কোনোকিছু জানানোর থাকলে তা কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জানাতে হয়। কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধিরা প্রতিষ্ঠান ও কাস্টমারের মাঝে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে থাকে।

কার্যকর বাজেট নিরূপণ

আপনার শুরু করতে যাওয়া ই-কমার্স ব্যবসা পরিকল্পনাটিকে সফল করার জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বাজেট নিরূপণ করা অত্যাবশ্যকীয়। আপনি যখন উপরিউক্ত ধাপগুলোকে একে একে পরিকল্পনা করছেন, তখন এর পাশাপাশি বাজেটগুলো লিখে ফেলুন। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে আপনার কতটা বিনিয়োগ করা প্রয়োজন এবং ব্যবসা শুরুর পরবর্তী তিনমাসের জন্যও একটি সম্ভাব্য বাজেট তৈরি করে ফেলুন। এতে করে ব্যবসা শুরুর পরপরই আপনার বিনিয়োগ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না, কারণ আপনার কাছে একটা প্রাথমিক ধারণা তো রইলোই।