ইকমার্স বিজনেসে সেলস বাড়াতে ব্র্যান্ডিং কেন জরুরী?

ব্যবসা ক্ষেত্রে খুব পরিচিত একটি শব্দ “ব্র্যান্ডিং” – হোক সে অফলাইন বা অনলাইন ব্যবসা। প্রতিযোগিতার দৌড়ে ব্র্যান্ডিং ই পারে আপনার প্রোডাক্টকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে কাস্টমারদের পছন্দের শীর্ষে তুলে নিয়ে আসতে।

ইকমার্স বিজনেসে সেলস বাড়াতে ব্র্যান্ডিং কেন জরুরী?

ধরুন, গ্রীষ্মের প্রখর খরতাপে কিছুটা স্বস্তি পেতে আপনি একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকলেন – উদ্দেশ্য পান করার জন্য একটি কোমল পানীয় কেনা। দোকানের ফ্রীজে থাকা হরেক রকমের কোমল পানীয়ের মাঝে আপনি বেছে নিলেন কোকা-কোলা। বলুন তো, কেন আপনি কোকা-কোলাকেই বেছে নিলেন? উত্তরটা সহজ – তা হল ব্র্যান্ডিং ।

ব্র্যান্ডিং নিয়ে একটি গল্প বলি । Heinz এর নাম শুনেছেন নিশ্চয়? সারা বিশ্বেই Heinz টমেটো সস আর বেকড বিনের খুব জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড। 

তো, একবার ইংল্যান্ডে Heinz এর প্রতিদ্বন্দ্বী একটি কোম্পানি চিন্তা করলো ‘কেন Heinz তাদের চেয়ে জনপ্রিয়’ সেটা তারা খুঁজে বের করবে । তারা একটা ‘Blind Taste Test’ আয়োজন করলো।  আশ্চর্যজনক ভাবে, যারা এই test এ অংশ নিলো তাদের দুই তৃতীয়াংশ Heinz এর প্রোডাক্ট এর taste এর চেয়ে আয়োজকদের প্রোডাক্ট বেশি পছন্দ করলো । কিন্তু যেই তাদের সামনে Heinz আর তার কম্পিটিটরের প্রোডাক্ট রাখা হলো, তারা Heinz এর প্রোডাক্ট পছন্দ করতে শুরু করলো ! 

ব্র্যান্ড আক্ষরিক অর্থেই আমাদের পছন্দকে বদলে দিতে পারে। 

মানুষের ব্যস্ততা আর সময়স্বল্পতার কারণে ইট-পাথরের তৈরি দোকানগুলোর চেয়ে প্রযুক্তি নির্ভর অনলাইন দোকান অর্থাৎ ই-কমার্স সাইটগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বেশী। তাই ই-কমার্স ব্যবসার জনপ্রিয়তা উত্তোরত্তর বেড়েই চলেছে। 

এই লেখাতে আমরা  “ব্র্যান্ডিং” এবং ই-কমার্স ব্যবসায় ব্র্যান্ডিং এর পরিধি ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করবো । 

প্রথম অংশে থাকছে – কিভাবে একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

দ্বিতীয় অংশে থাকছে – নতুন উদ্যোক্তা এবং নিযুক্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং এর গুরুত্ব।

এবং শেষ অংশে থাকছে – ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে আপনি কী কী  কৌশল অবলম্বন করবেন।

কিভাবে একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে হয়
ব্র্যান্ডিং কি? ব্র্যান্ডিং হল কাস্টমারের কাছে আপনার প্রতিশ্রুতি। হাজারো প্রোডাক্ট ও সার্ভিসের মধ্যে কাস্টমার কেন আপনার ই-কমার্স সাইট থেকে প্রোডাক্ট ক্রয় করবে তা নির্ভর করে আপনার ব্র্যান্ডিং এর উপর। প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আপনাকে এগিয়ে রাখতে ও কাস্টমারদের নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে ব্র্যান্ডিং অপরিহার্য। 

ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার যাত্রাটা খুব একটা সহজ নয়। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে, অনেকটা সময় বিনিয়োগ করে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। 

আপনার ই কমার্স বিজনেসটিকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এই কৌশলগুলো অবলম্বন করুন –

১. প্রথমেই আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সুন্দর রং ও ডিজাইন সম্বলিত লোগো তৈরি করুন। অনেক সময় আমরা কোম্পানীর নাম না দেখে শুধু লোগো দেখেও বুঝে যাই যে পণ্য কোন প্রতিষ্ঠানের।  

লোগো যে খুব আহামরি কিছু হতে হবে এমন নয় । কিন্তু এমন একটি লোগো তৈরী করুন যেটা দেখে সহজেই কাস্টমার আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারে ।

২. লোগোর রং এর সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে আপনার ই-কমার্স ব্যবসার জন্য একটি পরিছন্ন, সহজে ব্যবহারযোগ্য ও মানসম্মত একটি ওয়েবসাইট তৈরী করুন। 

ই-কমার্স ওয়েবসাইটের কিছু অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট থাকে  যেমন – কার্ট ম্যানেজমেন্ট, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট, কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট, প্রমোশন বা অফার ম্যানেজমেন্ট । এগুলোতে নজর দিন। 

৩. আপনার ওয়েবসাইট এ প্রথমেই সব কিছু সেল করার চেষ্টা না করে সুনির্দিষ্ট কিছু পণ্য সেল করুন। যেমন: রকমারি। তারা কিন্তু প্রথমে শুধু মাত্র বই বিক্রি করতো। বর্তমানে বই এর পাশা পাশি তারা অন্যান্য পণ্যও সেল করে। 

৪. সঠিক মাধ্যমে আপনার ই কমার্স ওয়েবসাইটের সঠিক প্রচারণা চালান যাতে সবাই আপনার পণ্য সম্পর্কে জানতে পারে।  এজন্য বেছে নিতে পারেন ফেসবুক মার্কেটিং, ইমেইল মার্কেটিং, এসএমএস মার্কেটিং ।

৫.  ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে পণ্যের মোড়কের ভূমিকাও একেবারে কম নয়। সুন্দর মোড়কে, গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠে। তাই চেষ্টা করুন পণ্যের মোড়কে একটু বৈচিত্র আনতে। খুব সহজেই কাস্টমারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন। 

৬. সর্বদা পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখুন। কথায় এবং কাজে এক থাকুন। আপনার মনে হবে আপনি লাভ করতে পারছেন না বা লস হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে গুণগতমান সম্পন্ন পণ্যই আপনার ব্যবসা টিকিয়ে রাখবে।

৭. কাস্টমার সার্ভিস হল ইকমার্স বিজনেসের প্রাণ। একটি ই কমার্স বিজনেস কতদুর সফল হবে সেটি নির্ভর করে কাস্টমার সার্ভিস কোয়ালিটির উপর। তাই চেষ্টা করুন একটু এক্সট্রা সার্ভিস দিতে। 

Zappos এর নাম শুনেছেন? তারা তাদের ব্যবসায় বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেছে শুধুমাত্র তাদের কাস্টমার সার্ভিস এর কারনে। 

নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং এর গুরুত্ব
খুব স্বল্প পরিসরে আপনি হয়ত ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করেছেন, ভাবছেন প্রাথমিকভাবে ব্র্যান্ডিং আপনার ব্যবসার জন্য কতটুকু সহায়ক হবে বা আদৌ এর প্রয়োজন রয়েছে কিনা। অথবা হয়তো আপনি ইতিমধ্যে ই-কমার্স ব্যবসার সাথে যুক্ত আছেন, কিন্তু সফলতার মুখ দেখা হয়ে ওঠেনি এখনো। 

ব্যবসায় অসফল হওয়ার অনেক কারণ হয়ত যাচাই করছেন, কখনো কি অবসরে ভেবে দেখেছেন যে আপনার ব্র্যান্ডিং সঠিকভাবে করা হয়েছিল কিনা। 

বাজারে বহু কোম্পানির মিনারেল ওয়াটার বোতলজাত করে বিক্রি হয়ে থাকে। সব বোতলেই রয়েছে সেই একই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানি, আপনি এত প্রতিষ্ঠানের মাঝে কোন একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মিনারেল ওয়াটার কিনে থাকেন। কেন বলতে পারেন?! উত্তরটা সহজ শুধুমাত্র ব্রান্ডিং এর কারণে। 

১. ব্র্যান্ডিং কাস্টমারকে আপনার ই-কমার্স সাইটের পণ্য সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। 

২.সঠিকভাবে ও কৌশলগত উপায়ে ব্র্যান্ডিং করা হলে তা আপনার বিক্রয়ের পরিমাণকে বাড়িয়ে দেয় বহুলাংশে।

৩. ব্র্যান্ডিং এ সফলতার সাথে সাথে ব্যবসার যেমন উত্তোরত্তর উন্নতি ঘটতে থাকে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডার এমন সফল ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠে। 

৪. ব্র্যান্ডের কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা আপনার পণ্য নকল করে বাজারজাত করলেও আপনার বিজনেস ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং কাস্টমাররা আসল পণ্য কেনার জন্য আপনার উপর নির্ভর করে। ফলে বেচাকেনা বেড়ে যায়। 

৫.আপনি আপনার ব্র্যান্ডকে যেই উচ্চতায় দেখতে চান, সেই অনুযায়ী পণ্যের গুনগত মান ধরে রাখুন এবং প্রোডাক্ট ডেলিভারির প্রতি সময় সচেতন হোন। মানুষ আপনার পণ্য ও সেবার উপর ভরসা রাখতে শুরু করবে। 

৬.  মানুষ স্বভাবসুলভ কারণেই ব্র্যান্ডের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে, কারণ ব্র্যান্ড শব্দটার সাথে একটা ভরসা জড়িয়ে থাকে। আপনার পণ্যের সঠিক ব্র্যান্ডিংই পারে আপনাকে হাজারো প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঝে একটি ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে।

৭. আমরা যখন কোন প্রোডাক্ট বা সার্ভিস ব্যবহার করে উপকৃত হই, তখন গল্পচ্ছলে তা অন্যের কাছে বলে থাকি বা তাকেও তা ক্রয়ে উৎসাহিত করে থাকি। এভাবে ব্র্যান্ডিং কাস্টমারকে আপনার ই-কমার্স সাইটের পণ্যের প্রতি অনুরাগী করে তোলে।

৮. যত বেশী মানুষের কাছে আপনার ব্র্যান্ডের নাম পরিচিত হবে, বাজারে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতাও তত বাড়বে। তাই প্রত্যেকটা কাস্টমারকেই সর্বোচ্চ সার্ভিস দেয়ার চেষ্টা করুন । মনে রাখবেন,

ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে আপনি কী কী কৌশল অবলম্বন করবেন
কৌশল অবলম্বনে সম্পাদন করা কোন সাধারণ কাজও সফলতায় অনন্য হয়ে উঠে। কখনো কখনো প্রায় অসম্ভব কাজও সুপরিকল্পিত ও বুদ্ধি খাটিয়ে করলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকট, সেখানে কৌশল অবলম্বনই টিকে থাকা এবং ভালো করার একমাত্র উপায় ।

ছোটবেলায় একটি তৃষ্ণার্ত কাকের কলস থেকে জলপানের গল্প আমরা কমবেশী সবাই পড়েছি। কলসের তলে পড়ে থাকা অল্প কিছু পানি কাকের পক্ষে কখনোই পান করা সম্ভব হত না, যদি না সে বুদ্ধি খাটিয়ে টুকরো টুকরো নুড়ি ফেলে সেই জলের স্তরকে উপরে তুলে না আনত।

১. আপনার ই-কমার্স ব্যবসার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। একটু দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করুন আগামী তিন বা পাঁচ বছরে আপনি নিজের ব্যবসা কে কোথায় দেখতে চান ।

২. টার্গেট কাস্টমার নির্ধারণ করুন,খুঁজে বের করুন কাদের কাছে আপনার প্রোডাক্ট ও সার্ভিস পৌঁছে দিতে চান।

৩. মার্কেটিং এর জন্য বাজেট নির্ধারণ করুন । মার্কেটিং হলো একটি বিজনেস এর মূল চালিকা শক্তি। মার্কেটিং ছাড়া আপনি কখনো ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারবেন না । 

৪. ঠিক করুন, কোন যোগাযোগ মাধ্যমেগুলো ব্যবহার করে আপনি আপনার প্রোডাক্টের প্রচারণা করতে চান।

৫. পণ্যের মান বজায় রাখুন। পরিকল্পনা করুন, কিভাবে দ্রুততম সময়ে আপনি গ্রাহকের কাছে প্রোডাক্ট বা সার্ভিস পৌঁছে দিবেন।

৬. ভার্চুয়াল জগতে যথেষ্ট তথ্য না পেলে কাস্টমার কোন কিছু ক্রয় করতে দ্বিধা করে। তাই কন্টেন্ট মার্কেটিং এর উপর জোর দিন। তথ্যবহুল কিন্তু চিত্তাকর্ষক কন্টেন্ট তাদের সামনে উপস্থাপন করুন।

৭. ইমেইল মার্কেটিং এ গুরুত্ব দিন। অনেকেই এই ব্যাপারটাতে কম গুরুত্ব দেয়, কিন্তু ইমেইল মার্কেটিং এ প্রতি ১ টাকা খরচের বিপরীতে প্রায় ৩২ টাকা রিটার্ন পাওয়া যায়। 

৮.কাস্টমারদের অফার, ডিসকাউন্ট ও কুপন প্রদান করুন। তাদের কে আপনার প্রোডাক্টের প্রতি আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আয়োজন করুন এবং ভালো সামাজিক উদ্যোগের সাথে আপনার ব্যবসাকে জড়িত করুন। 

৯. আপনার ফেইসবুক বা গুগল পেজ এ আপনার প্রোডাক্ট এবং সার্ভিস সম্পর্কে কাস্টমারদের রিভিউ নিন। এর ফলে অন্য কাস্টমাররা সহজেই আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং আপনার ব্র্যান্ড ভ্যালু বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমান সময়ে গড়ে প্রতিদিনই একটি করে নতুন ই-কমার্স সাইট তৈরী হচ্ছে । যেহেতু ই-কমার্স বিজনেসে ইনভেস্টমেন্ট কম দরকার ও বড় কোন লসের ঝুঁকি থাকে না তাই অনেকেই এই ব্যবসায় আগ্রহী হয়ে উঠছে। 

সফল রিটেইলার ব্যবসায়ীরাও ই কমার্স বিজনেসের গুরুত্ব উপলব্ধি করে রিটেইল শপের পাশাপাশি ই-কমার্স ব্যবসায় আসছেন । তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাজারে ব্র্যান্ডিং-ই পারে কেবল আপনাকে সকলের মাঝে সুপরিচিত করে তুলতে পারে।